নবাবি কলকাতা

কলকাতা ও লখনঔ প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থিত দুই শতাব্দী-প্রাচীন জনপদ। দু’য়েরই ইতিহাস সমৃদ্ধ, যোগাযোগ নিবিড়। বর্তমানে দেশজুড়ে বেড়ে চলা রাজনৈতিক বিদ্বেষ এই ব্যবধানে খানিক থাবা বসালেও, গরিমার ঐতিহ্য অক্ষুন্নই থেকেছে।ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু বাঙালি, প্রাচীনকে সঙ্গী করে বহমান কালের স্রোতে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আঁকড়ে থেকেছে। পারেনি ধরে রাখতে সবটুকু, থামেনি তবু। সমৃদ্ধ অতীত উলটেপালটে বাঙালি মননে নাড়া দিয়েছেন কখনও হুতোম, কখনও শ্রীপান্থ। হালের সুদীপ্ত মিত্র কিংবা ইতিহাসবিদ রোজি লিউলিন জোন্স শিকড়ের সন্ধানে পূর্বসূরিদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন মাত্র।
সালটা ১৮৫৬। সদ্য স্বভূমে সিংহাসনচ্যুত নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ্। লখনঔয়ের কোনও প্রাসাদে অন্তরালে কাটাতে পারতেন নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। ভোগ করতে পারতেন কোম্পানি কর্তৃক প্রদেয় বিরাট অংকের পেনশনের সুবিধা। তা না করে ভেসে পড়লেন নৌকায়, লক্ষ্য কলকাতা। উদ্দেশ্য, কাউন্সিলের কর্তাদের কাছে তদবির করে রাজ্যপাট ফিরিয়ে নেওয়া। সফল না হলে যাবেন লন্ডনে, রানী ভিক্টোরিয়ার কাছেও। আদতে, ইংরেজদের ‘ন্যায়পরায়ণ’ ভাবমূর্তি নিয়ে নিঃসংশয় ছিলেন নবাব। ১৮৫৬ সালের মে মাসে, কলকাতার নদীতীরে নোঙর করল জেনারেল ম্যাকলিওড নামে এক বিলাসবহুল তরী। আরোহী আওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ্। ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হয়ে প্রায় ৯ বছরের রাজ্যপাট চুকিয়ে বিদ্ধস্ত সম্রাট এসে পৌঁছলেন গঙ্গাতীরে। ইংল্যান্ডে রানীর দপ্তরে পাড়ি দেওয়ার আগে কলকাতা ছিল সাময়িক বিরতি স্থল। সেই বিরতি যে নির্বাসনের রূপ নেবে, সে-বিষয়ে একেবারেই অবগত ছিলেন না নবাব।
ওয়াজিদ আলী কোথায় অবতরণ করেছিলেন সেই নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কেউ-কেউ মনে করেন এটি বর্তমান গার্ডেনরিচে চক্ররেলের লাইন সংলগ্ন ‘ভূত ঘাট’। অথবা কারুর মতে, এটি আসলে মেটিয়াবুরুজের ‘বিচালি ঘাট’ কিংবা ‘দহি ঘাট’। যদিও ইতিহাসবিদ রোজি লিউলিন জোনস, তাঁর ‘লাস্ট কিং ইন ইন্ডিয়া’ বইতে প্রিন্সেপ ঘাটকে নবাবের প্রথম পদচিহ্নের ধারক তকমায় অভিহিত করেছেন।
ইতিমধ্যে রাজার স্বাস্থ্যের ঘোর অবনতি হয়েছে। নৌকায় দীর্ঘ আমাশয়ে শরীর দুর্বল। অগত্যা বাধ্য হলেন নামতে। তখন গঙ্গাতীরে ইউরোপীয়দের বাস। নদীর পাড় ধরে প্রায় আড়াই মাইল বিস্তৃত সুসজ্জিত বাগানঘেরা অট্টালিকা। ব্রিটিশদের এই বাগানকে কেন্দ্র করেই জনপদের নাম হয় ‘গার্ডেনরিচ’, যাকে ঘিরে গড়ে ওঠে নবাবের ‘ছোটা লখনঔ’। ওই অংশে মোট ১৩টি বাংলো ছিল, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত রাজার স্থান হয় ১১ নম্বরে। একসময় এটি আবার সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি স্যার লরেন্স পিলের বাসভবন ছিল।