ভরসা দেয়, সাবেকি ক্রিকেট

বর্ষা বয়ে আনে বিষাদ, কেড়ে নেয় যাবতীয় হর্ষ। চশমার কাঁচে বাষ্প জমে, ঘনীভূত হয়। জং-ধরা ছাতার সেলাই পেরিয়ে পাড়ি দেয় ধূসর আকাশে। বর্ষা কোনোদিনও দুঃখ দিতে ভোলেনি। কত পুরোনো চিঠির পাহাড় জমেছে, কত অ্যালবাম হয়েছে হলদেটে, তারপর আর খুলে দেখা হয়নি কোনোদিন। জমেছে পুরোনো ট্রাঙ্কে। যে ট্রাঙ্কে পড়ে থাকা আসবাবের ভিড়ে জায়গা করে নেয় ইঁদুরে কাটা পুরোনো বর্ষাতিটা আর বেরিয়ে থাকে একফালি এমআরএফ সাঁটা উইলো। কখনো যা ছুঁয়ে দেখলে বিদ্যুৎ ঝলকায় স্মৃতির জলছবি। কত না পারা ইচ্ছে, কত ইতিহাস টিউশন ডুব। তারপর রংচটা জার্সি গায়ে মাঠে নেমে পড়া হুলুস্থূল। ভেবেছিলাম, বৃষ্টি নাহলে ক্রিকেট খেলবো। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, খেলা হয়নি। মনখারাপ নিয়ে বাড়িতে ফিরে বিচ্ছিরি ত্রিকোণমিতি। যা কোনওদিনও মেলাতে পারবে না শোয়েব বসিরের ওই বল কী করে প্লেডঅন হয়ে উইকেটে যায়। আদতে যারা বলে ভাগ্য বলে কিস্যু হয় না, তারা সব মিথ্যুক। এমনই বর্ষার অঝোর স্পর্শে ক্লাবের দেয়ালে গাঢ় লাল মুছে গিয়েছিল। কাস্তের হাতলে একমনে তুলি বোলাতে বোলাতে অর্জুনদা বলেছিল, সেও ছাত্র-রাজনীতি ছেড়ে নতুন চাকরি পেয়ে আমেরিকা পাড়ি দিচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু পরের বছর টুর্নামেন্টের আগেই দেখলাম অর্জুনদা ট্রলি গুছিয়ে বিদেশে সেটেলড। আমাদের অবুঝ মন ভাগ্যকে গালি দিয়ে আদর্শকে সম্বল করল আষ্টেপৃষ্টে। তারপর কলেজপাস করে লিঙ্কড ইন খুলে আবিষ্কার করলাম, আদর্শ আর পুঁজির ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। পুঁজিই সই। পুঁজিই পকেট ভরে, পুঁজিই জোগায় আবগারি ওয়েদারে সিঙ্গেল মল্ট। অগত্যা বৃষ্টিস্নাত কলকাতার কাব্যিক নস্টালজিয়াকে উপেক্ষা করে পুঁজির দালালি ব্যাঙ্গালোরে। খিচুড়ির গন্ধ নেই, ইলিশের বাঁচিয়ে রাখা তেল নেই, ডালের বড়া আর কাঁচা লঙ্কা নেই, আছে শুধু অনন্ত দৌড়। তবু কেউ কেউ ছিল নিতান্তই বোকা। যারা প্রবল বর্ষায় ছাতা ভুলে যায়। বা হয়ত ভালোবাসে বর্ষার ছোঁয়াচ। ভালোবাসে বাসের পিছনের আধভেজা জানলার সিট্। ভালোবাসে লোকাল ট্রেনের দরজায় মুক্তোর মত ছিটকে আসা ধারাস্নান। আমাদের অতো সময় কোথায়। টি-টোয়েন্টি জীবন। উইকেন্ডে সিরিজ দেখা, কিংবা চ্যাম্পিয়নস লীগ। পাঁচদিনের খেলা তো সেই কবেই বাতিলের খাতায়। তবু ওরা ভালোবাসে, যারা অমলকান্তি কিংবা রোদ্দুর, কিংবা বর্ষার কালো মেঘ। ধরি এক্সের মান অনির্বাণ। আমরা হাইওয়ে পেরিয়ে অনেকটা পাড়ি দিয়েছি। চা খাবো বলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে অনেক খুঁজেছি ওদের। কিন্তু পাইনি। আমরা শুধু জেতার খোঁজে হারিয়েছি সব। ওরা ক্রিজে টিকে থেকেছে। যেভাবে হোক, যেমন করে। ভেবেছিলাম প্রথম একঘন্টাতেই সবটুকু শেষ। তবু জাদেজা ভরসা জোগায়। ভরসা দেয়, সাবেকি ক্রিকেট। ধ্রুপদী ব্যাটিং, সেই অদ্ভুত ধীর, স্থিতধী, লক্ষ্যে অবিচল অর্ধশতরান। সাথে কামানের বিপরীতে বাঁশের কেল্লা গড়ছেন বুমরাহ কিংবা সিরাজ। আমরা তো সেই কবেই হেরে গিয়েছিলাম। ওরা লাল আকাশকে পিছনে রেখে মাঠ পার হয়ে এগিয়ে এলো। আমরা বিদ্ধস্ত, জানি হেরে যাবো। তবু ওরা হারার আগে মাঠ না ছাড়ার শপথ নিল। আমরা জীবনের দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। আমরা জিততে জিততে সবটুকু হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে ফেলেছি না পাওয়া নরম বেদনাগুলো। দেরি হয়ে গেছে অনেকটা। তবু ওরা বোঝালো জীবন আদতে টি-টোয়েন্টি নয়, লাল বলের ক্রিকেট। ঘাতক ডিউজ ধেয়ে আসবে শরীরে। শর্টলেন্থ গায়ে কালশিটে ফেলবে টেলএন্ডারদের। দৌড়ে আসতে হবে তৎপর ফিজিওকে। কিন্তু ঠিক তারপরেই উঠে দাঁড়াবেন সিরাজ। সেই সচেতন ডিফেন্স। পরীক্ষা দেবেন প্রবল ধৈর্য্যের। অন্যপ্রান্তে জাদেজা। কত মহাকাব্যের নীরব নায়ক। তবু অধিকাংশ সময়েই চর্চার অন্তরালে। বর্ষা ফুরোলে কেইবা ছাতাকে মনে রেখেছে। জুলাইয়ের বৃষ্টি জমিয়ে রাখে অতীত বেদনা। ২০১৯ থেকে ২০২৫। ওল্ডট্র্যাফোর্ড থেকে লর্ডস। টেমসের বুকে বয়ে গেছে কত বর্ষার জল। আমরা বেশ কিছুটা বুড়ো হয়েছি। সঞ্জয় মঞ্জরেকরও হয়েছেন। পুরোনো কথা মনে রাখতে নেই। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইটা লড়ে যেতে হয়। জানকবুল। একদিন কোনো এক বর্ষায় আমরা একসাথে দৌড়ে যাবো জমা জল পেরিয়ে। তারপর উপুড়ঝুপুরি দৌড়ে লাফাবো কোনো এক পানাপুকুরে। একসাথে ভিজবো বৃষ্টিতে। বর্ষার বিষাদেও প্রেম মিশে থাকে। ভালোবাসতে শেখায় পুরোনোকে, ঐতিহ্যকে, টেস্ট ম্যাচকে। আমাদের ভালোবাসার নৌকা সেদিন জমা জলের নালা পেরিয়ে পাড়ি দেবে কোনো এক মহাসাগরে। খুঁজে পাবো হারিয়ে যাওয়া ক্যাম্বিস বল। ছুঁতে পাবো অপূর্ণ সব ইচ্ছেগুলো। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহর জুড়ে পরাজিত মানুষের হরতাল। সব হেরোরা সেদিন হিরো হবে।